মতামত: সাহাবুর রহমান শিহাব : ২০১৬ সালের পর থেকে সার্কের আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের আবাসস্থল দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি শুধু একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতাই নয়, বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার গভীর সংকটের প্রতীক। জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র আঞ্চলিক সংস্থা আজ কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) কখনোই কেবল একটি আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, যার মাধ্যমে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান একটি অধিক সমন্বিত, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল। সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করার পাশাপাশি সার্ককে কল্পনা করা হয়েছিল অর্থনৈতিক সংহতি, সমষ্টিগত নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ স্থবিরতার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছে।
সার্কের অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় কারণ ভারত–পাকিস্তান বৈরিতা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর সম্পর্ক গভীর অবিশ্বাস ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর। ২০১৬ সালের উরি হামলার পর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ভারত বয়কট করে এবং পরবর্তীতে অন্য কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্রও সরে দাঁড়ায়। কাশ্মীর সংকট, সীমান্ত উত্তেজনা এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগের ফলে সার্ক কার্যত কূটনৈতিক অচলাবস্থায় পড়ে যায়।
এর পাশাপাশি আঞ্চলিক পরিসরে ভারতের প্রভাবশালী অবস্থানও দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক আস্থার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ও প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে ভারতের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো ছোট দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধারণা রয়েছে যে, আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো অনেকাংশেই ভারতের অগ্রাধিকার অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বিশেষ করে ২০১৫ সালে নেপালের সংবিধান প্রণয়নের সময় সীমান্তে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাঠমান্ডুতে ব্যাপকভাবে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক অবরোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের ঘটনা আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় সমতার চেতনাকে দুর্বল করেছে।
একই সঙ্গে দুর্বল অর্থনৈতিক সংযোগ সার্কের কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ, যেখানে আসিয়ানে এই হার ২৫ শতাংশেরও বেশি। উচ্চ শুল্ক, কঠোর ভিসা ব্যবস্থা এবং দুর্বল আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামোর কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অনেক সময় ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য করা প্রতিবেশী দেশের তুলনায় সহজ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সার্ক কখনোই একটি কার্যকর অর্থনৈতিক জোটে পরিণত হতে পারেনি।
অন্যদিকে, চীনের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব বিনিয়োগ একদিকে অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও, অন্যদিকে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়িয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়েছে এবং সার্কভিত্তিক বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও দুর্বল হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সার্কের বর্তমান সংকটের মূল কারণ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাব। দ্বিপক্ষীয় বিরোধকে আঞ্চলিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার মানসিকতার অভাবে সংস্থাটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের অনমনীয় অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে সার্কের কার্যক্রমকে স্থবির করে রেখেছে এবং দক্ষিণ এশীয় ঐক্যের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সার্কের স্থবিরতার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উভয় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, কার্যকর আঞ্চলিক সংহতি গড়ে উঠলে দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বর্তমান প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে বছরে ৬৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। কিন্তু সহযোগিতার অভাবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
একই সঙ্গে সার্কের অচলাবস্থা আন্তঃসীমান্ত বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি বিলম্বিত করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়া এখনো সমন্বিত আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি হলো দক্ষিণ এশিয়া।
মাদক পাচার, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার মতো নিরাপত্তা ইস্যুতেও কার্যকর সহযোগিতা গড়ে ওঠেনি। আন্তঃরাষ্ট্রীয় হুমকির এই যুগে এমন সমন্বয়ের অভাব সব সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
আঞ্চলিক বিভক্তির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত দরকষাকষির সক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জলবায়ু ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এই অঞ্চলের কণ্ঠস্বর প্রত্যাশিত প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না।
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক বাস্তববাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবনের সমন্বয়। প্রশ্ন হলো—সার্ককে কি আবারও কার্যকর করা সম্ভব? উত্তর হলো, সম্ভব। তবে তার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে দ্বিপক্ষীয় বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে আঞ্চলিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা যে দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যেও সম্ভব, তার প্রমাণ ইতিহাসেই আছে। আসিয়ানের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ১৯৬০-এর দশকে সশস্ত্র সংঘাত হয়েছিল, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত বিরোধ দশকের পর দশক ধরে চলেছে, তবু আসিয়ান টিকে আছে এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও গড়ে উঠেছিল ফ্রান্স ও জার্মানির শতাব্দীপ্রাচীন শত্রুতার ভস্মের উপর। এই দুটি উদাহরণ বলে, রাজনৈতিক বিরোধ আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্তরায় নয়, যদি থাকে যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং অভিন্ন স্বার্থের স্বীকৃতি। দক্ষিণ এশিয়ার সামনেও সেই পথ খোলা আছে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সংলাপ পুনরায় শুরু করতে হবে। তাদের সম্পর্কের ন্যূনতম উন্নতি ছাড়া সার্ক কখনোই কার্যকর হতে পারবে না। পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং ক্রীড়া কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ১৯৯৯ সালের লাহোর ঘোষণার চেতনাকে সামনে রেখে একটি নতুন কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
পাশাপাশি সার্ককে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর পরিবর্তে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীলতার মতো তুলনামূলক অরাজনৈতিক খাতে কার্যকর সহযোগিতার ওপর জোর দিতে হবে। ইতিহাস দেখিয়েছে, কারিগরি সহযোগিতাই অনেক সময় রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করে।
বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে সার্কের প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব ধরে রাখতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পর্ক সংলাপ ও আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতামূলক কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সার্কের জন্মও হয়েছিল ঢাকার উদ্যোগে। ফলে সংস্থাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রশ্নে বাংলাদেশের নৈতিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (SAFTA) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও জরুরি। শুল্ক হ্রাস, কাস্টমস প্রক্রিয়ার সমন্বয়, উন্নত পরিবহন অবকাঠামো এবং সহজতর ভিসা ব্যবস্থা ছাড়া এই চুক্তি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
একই সঙ্গে একটি বাস্তববাদী “দ্বৈত-ধারার কূটনীতি” গ্রহণ করা যেতে পারে। বিমসটেক (BIMSTEC)-এর মতো উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো সার্কের বিকল্প নয়; বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও কার্যকর সহযোগিতা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে এবং ধীরে ধীরে বৃহত্তর আঞ্চলিক ঐকমত্য গড়ে উঠতে পারে।
সবশেষে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি সম্মানই আঞ্চলিক আস্থা পুনর্গঠনের ভিত্তি হতে পারে।
বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সার্ক কার্যকর হতে পারে না। একই সঙ্গে ভারত ও তার প্রতিবেশীদের, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতার অবসান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন। তাই অনেকে মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে বিমসটেক ও অন্যান্য উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগই অধিক বাস্তবসম্মত সহযোগিতার পথ হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত সার্ককে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং তাকে পরিপূরক হিসেবে শক্তিশালী করা।
সবশেষে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বলে, সংঘাত এই অঞ্চলের নিয়তি নয়; সহযোগিতাও তার ঐতিহ্যের অংশ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারলে সার্ক আবারও আঞ্চলিক সংহতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের এই অঞ্চল আরও বহু বছর অপূর্ণ সম্ভাবনার ভার বহন করবে।
লেখক: সাহাবুর রহমান শিহাব, চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী , আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন