আশিকুর রহমান শান্ত ভোলা জেলা প্রতিনিধি : গত অর্থবছরে ভোলা পৌরসভায় মশক নিধনের জন্য প্রায় ৪৫ লাখ টাকার বাজেট ছিল। এর মধ্যে ৪১ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও পৌর এলাকায় দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। মশার উপদ্রব বৃদ্ধি ও ডেঙ্গু আতঙ্কের মধ্যে পৌরসভার এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সারাদেশের মতো ভোলা পৌরসভায়ও দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গু মশার উপদ্রব। মশার কামড়ে জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। অথচ মশা প্রতিরোধে পৌরসভার মূল কাজ মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা ও মানুষকে সচেতন করা। কিন্তু এর কোন কার্যক্রমই ভোলা পৌরসভা থেকে নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ পৌরবাসীর৷
তাদের অভিযোগ, ৬/৭ মাস পূর্বে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হয়েছে এক-দুইবার। এরপর এখন পর্যন্ত আর কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভার বিভিন্ন যায়গায় যেমন, আবহাওয়া অফিস রোড, পৌর ভূমি অফিস রোড, ভদ্রপাড়া, গাজীপুর রোড, উকিল পাড়া, কালিবাড়ী রোড, নবী মসজিদ রোড, নূর মসজিদ রোড, মুসলমান পাড়া, রিজার্ভ পুকুর পাড়সহ প্রায় সকল এলাকার ড্রেনে জমে আছে ডেঙ্গুর লার্ভা।
পৌরসভার চিত্র দেখে মনে হচ্ছে, মশার চাষ করছেন ভোলা পৌর কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন এলাকার রাস্তার পাশে পড়ে আছে দীর্ঘদিনের ময়লা ও বর্জ্য। অনেক যায়গায় জমে আছে বৃষ্টির পানি। পৌরসভার দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পৌরবাসী।
তথ্য বলছে, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিধনের কাজে বাজেট করেন ৪৫ লাখ টাকা। আর খরচ দেখানো হয় ৪১ লাখ ২২ হাজার ৯০০ টাকা। বর্তমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশা নিধনের জন্য ১৮ লাখ টাকা বাজেট করা হয়। তবে অনুসন্ধানে ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মশা নিধনের কার্যক্রম জোরালোভাবে দেখা যায়নি। প্রায় ৬/৭ মাস পূর্বে পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে ১ বার ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হয়েছে। এরপর আর এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।
হাসপাতাল রোড বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান ও গাজীপুর রোডের সাইয়েদ আলী জানান, বাড়িতে মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। মশার জ্বালায় বাসায় থাকা যায় না। মশার কয়েল জ্বালিয়ে থাকি। মশারি টানালেও মশারির মধ্যে ঢোকে, ছোট বাচ্চাদের কামড় দেয়। এতে হাত-পা ফুলে যায়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র সভাপতি মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী জানান, পৌরসভা থেকে ছয়-সাতমাস আগে তার এলাকা উকিল পাড়ায় একবার ওষুধ ছিটিয়েছেন। তারপর এত মাস পার হয়ে গেলেও কোনো খবর নেই। তিনি ফ্রি সময় বাড়িতে বই পড়েন। মশার কয়েল জ্বালিয়ে, ফ্যান চালিয়েও মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পান না। ঘরে বসে খাওয়া-দাওয়ার সময়ও মশার কামড়ে স্বপ্তি পাওয়া যায় না। তিনি আরও জানান, সারাদেশে ডেঙ্গুর এখন ভয়াবহ অবস্থা। সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা প্রয়োজন। এই সতর্ক করার দায়িত্ব পৌরসভার। কিন্তু পৌরসভা সে দায়িত্ব পালন করছে না। তারা ডেঙ্গু ও এডিস মশা নিধনের জন্য ভোলায় দৃশ্যমান কোনো কাজ করছে না। পৌরসভা পৌরবাসীর স্বার্থে কাজ না করে লুটপাট করছে। তারা ঠিকমতো ড্রেন পরিষ্কার করে না। মশা নিধনের জন্য ওষুধ দেয় না। শুধু কাগজে কলমে তাদের কার্যক্রম দেখার অর্থ আত্মসাতের জন্য।
উকিল পাড়ার নোমান জানান, তাদের সেখানে গত বছর শীতের পর একবার পৌরসভা থেকে ওষুধ দিয়েছে। এরপর আর দেয়নি। বর্তমানে মশার উপদ্রব বেশি হওয়ায় বসতঘরে থাকা কষ্ট হয়ে পরছে। তাদের এখানে মশার কামড়ে অনেকের জ্বর হয়েছে। কারো কারো ডেঙ্গু জ্বরও হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
আবহাওয়া অফিস সড়কের বাসিন্দা আরিফ হোসেন জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মশার অনেক কম থাকে। সন্ধ্যার পর থেকে পুরো এলাকা মশার নিয়ন্ত্রণে থাকে। পৌরসভা থেকে বর্তমানে ধোঁয়া-ও ওষুধ ছিটানো হচ্ছে সরকারি অফিসগুলোতে। আর সাধারণ মানুষের বাড়ি-ঘরে ধোঁয়া ও ওষুধ দেওয়া হয় না। মশা আমাদের সাধারণ মানুষের জন্য একটা দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিল্লাহ মসজিদ সড়কের অ্যাডভোকেট শাহাদাত শাহীন বলেন, মশা নিধনের জন্য প্রতিবছরই ভোলা পৌরসভার বাজেট থাকে। গত ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা বাজেট হয়। অথচ তেমন কার্যক্রম আমাদের চোখে পরেনি। মশার জন্য ধোঁয়া, ওষুধ ছিটানোর, ড্রেন পরিষ্কার, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ বা মাইকিং করতেও দেখিনি। প্রায় ৭/৮ মাস আগে নামমাত্র ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হয়েছে, তা তেমন কোনো কাজে আসেনি। তাহলে গত অর্থবছরের এত টাকা কীসে ব্যয় করা হলো ভোলা পৌরবাসী তা জানতে চায়। বর্তমানে বর্ষার পরবর্তী সময়ে পৌরসভার কাজ করার কথা, কিন্তু তাদের কোনো কার্যক্রম পরিচালনা এখন পযর্ন্ত চোখে পড়েনি৷
এবিষয়ে পৌর প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বেলাল হোসেন অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি এ বছর এপ্রিল থেকে ভোলা পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। যার কারণে অনেক কিছুই তার জানা নেই। গত অর্থবছরের যে ওষুধ কেনা হয়েছে তা এখনও রয়েছে তার জানামতে। তবে এ বছর অতি বৃষ্টির কারণে ড্রেন পরিস্কার ও মশা নিধন অভিযান ব্যহত হচ্ছে বলেও জানান তিনি৷
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন